কুরআন যখন এসেছে, তখন এটি বহু বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো—এটি অদৃশ্যের (গায়েবের) সমস্ত পর্দা ছিঁড়ে ফেলেছে। এটি সময় ও স্থানের সীমানা ভেঙে দিয়েছে। কীভাবে?
অদৃশ্যের পর্দা মূলত তিনটি: প্রথমটি হলো- স্থানের পর্দা, অর্থাৎ একই মুহূর্তে অন্য কোনো স্থানে কিছু ঘটছে কিন্তু আমি তা জানি না কারণ আমি অন্য জায়গায় আছি।
দ্বিতীয়টি হলো- অতীতের পর্দা, যা সময়ের আবর্তনে আমার থেকে আড়াল হয়ে গেছে এবং আমি তার সাক্ষী ছিলাম না।
আর তৃতীয়টি হলো- ভবিষ্যতের পর্দা, অর্থাৎ আগামীকাল কী ঘটবে তা ভবিষ্যতের পর্দার কারণে আমার কাছে অদৃশ্য। অতএব অদৃশ্যের পর্দা তিনটি: স্থান, অতীত এবং ভবিষ্যৎ।
আমরা যদি কুরআন পড়ি তবে দেখব এটি অতীতের পর্দা ছিঁড়ে ফেলেছে। এটি আমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের খবর দেয়, পূর্ববর্তী রাসূলদের কাহিনী শোনায় এবং এমন সব গোপন বিষয় বর্ণনা করে যা কেউ জানত না। আর এটি কার মুখ থেকে বের হচ্ছে? একজন উম্মী (নিরক্ষর) নবীর মুখ থেকে, যিনি পড়তে বা লিখতে জানতেন না। অথচ তিনি অতীতের গভীর রহস্যগুলো অবলীলায় বলে দিচ্ছেন এবং যারা একে মিথ্যা বলছে তাদের চ্যালেঞ্জ করছেন। আল্লাহ তাঁর জন্য অতীতের পর্দা তুলে দিয়েছিলেন।
কুরআনে বারবার আসা “وما كنت” (এবং আপনি ছিলেন না) শব্দগুলো পড়লেই আপনি বুঝতে পারবেন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অতীতের অদৃশ্যের কত খবর দিয়েছেন!
যেমন:
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَىٰ مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ
“আপনি পশ্চিম প্রান্তে ছিলেন না যখন আমি মুসা আলাইহিস সালামকে আদেশ দিয়েছিলাম” (সূরা আল ক্বাসাস-৪৪)
وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ
“আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা তাদের কলম নিক্ষেপ করছিল যে কে মারইয়াম আলাইহাস সালামের দায়িত্ব নেবে।” (সূরা আলে ইমরান-৪৪)
এর অর্থ হলো—হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু আল্লাহ আপনাকে সেই খবর দিয়েছেন এবং অতীতের পর্দা সরিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ আরও বলেন:
وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا
“আপনি মাদয়ানবাসীদের মধ্যেও ছিলেন না যে তাদের কাছে আমার আয়াত তিলাওয়াত করবেন…।”(সূরা আল ক্বাসাস-৪৫)
وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَٰكِنْ رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ
“আপনি তূর পাহাড়ের পাশে ছিলেন না যখন আমি আহ্বান করেছিলাম, বরং এটি আপনার রবের পক্ষ থেকে এক রহমত।” (সূরা আল ক্বাসাস-৪৬)
এভাবে আমরা দেখি যে, কুরআন বিভিন্ন প্রসঙ্গে অতীতের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলদের সঠিক সংবাদ জানিয়েছে। একই সাথে এটি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর সেই অংশগুলোকে সংশোধন করে দিয়েছে যা পাদ্রী ও ইহুদী পণ্ডিতরা বিকৃত করেছিল।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কুরআনের মাধ্যমে ইহুদী ও খ্রিস্টান পণ্ডিতদেরকে চ্যালেঞ্জ করতেন এবং বলতেন—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত বা ইঞ্জিলে আছে, আর এটি তোমরা তাওরাত বা ইঞ্জিলে বিকৃত করেছ। তারা এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে কোনো জবাব দিতে পারত না। অতীতের পর্দা উন্মোচন করার ক্ষেত্রে কুরআনের এই চ্যালেঞ্জ পূর্ববর্তী আসমানী বার্তাগুলোর এত সূক্ষ্ম রহস্য পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, তা তাদের কিতাবের বিকৃতি ও গোপন করা বিষয়গুলোকে একদম স্পষ্ট করে দিয়েছিল এবং তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিল যে পারলে কুরআনের কথা মিথ্যা প্রমাণ করুক। কিন্তু তারা তা পারেনি। এরই একটি উদাহরণ হলো সূরা মারইয়ামে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
ذَٰلِكَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ ۚ قَوْلَ الْحَقِّ الَّذِي فِيهِ يَمْتَرُونَ
“ইনিই হলেন মারইয়াম আলাইহাস সালামের পুত্র ঈসা আলাইহিস সালাম। এটিই সত্য কথা,যে বিষয়ে তারা সন্দেহ পোষণ করে।” (সূরা মারইয়াম-৩৪)
